Monday, 11 October 2010

ঝালাপালা

জুড়ির গান


সখের প্রাণ গড়ের মাঠ
ছাত্র দুটি করেন পাঠ-
পড়ায় নাইকো মন
(সবাই) হচ্ছে জ্বালাতন !
অতি ডেঁপো দুকান কাটা
ছাত্র দুটি বেজায় জ্যাঠা,
কাউকে নাহি মানে
(সবাই) ধর ওদের কানে !
গুরুমশাই টিকিওয়ালা
নিত্যি যাবেন ঝিঙেটোলা
জমিদারের বাড়ি
(সেথা) আড্ডা জমে ভারি !

প্রথম দৃশ্য


পণ্ডিতঃ (স্বগত) রোজ ভাবি জমিদারমশাইকে বলে কয়ে তার বাড়িতেই একটা টোল বসাব। তা, একটু নিরিবিলি যে কথাটা পাড়ব, সে আর হয়ে উঠল না । বলি ন্যায়শাস্ত্র যে পড়েনি সে মানুষ‌‌ই নয়- সে গরু, মর্কট !

[নেপথ্যে সংগীত]

এই !- আবার চলল ! এ এখন সারাদিন চলতে থাকবে ! গলা ত নয়, যেন ফাটা বাঁশ ! গানের তাড়ায় পাড়াসুদ্ধ লোক ত্রাহি ত্রাহি কচ্ছে- কাগটা পর্যন্ত ছাতে বসতে ভরসা পায় না, অথচ ভাবখানা এমনি, যেন গান শুনিয়ে আমাদের সাতচোদ্দং তিপ্পান্ন পুরুষ উদ্ধার করে দিচ্ছে ! আ মোলো যে-

[ঘটিরামের প্রবেশ]

পণ্ডিতঃএত দেরি হল কেন ? এতক্ষণ কী কচ্ছিলি ?
ঘটিরামঃআজকে শিগগির শিগগির ছুটি দিতে হবে !
পণ্ডিতঃবটে ! অনেকদিন পিঠে কিছু পড়েনি বুঝি ! ছুটি কিসের ?
ঘটিরামঃতাও জানেন না ! ও পাড়ায় গানের মজলিস হবে যে ! বড় বড় ওস্তাদ-
পণ্ডিতঃ না, না, ছুটি পাবিনে- যা ! পড়ার সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এসেই ছুটির খোঁজ-
ঘটিরামঃ বাঃ ! ঝিঙেটোলার জমিদারবাবু আসবেন !
পণ্ডিতঃ লাট সাহেব এলেও যেতে পাবিনে। কেষ্টা কোথায় ?
ঘটিরামঃ জানিনে। ডেকে আনব ? ওরে কেষ্ট।

[প্রস্থানোদ্যম]
পণ্ডিতঃ থাক্‌‌ থাক্‌‌ , ডাকতে হবে না। ওখানে বসে পড়।
ঘটিরামঃ 'অল ওয়ার্ক্‌‌ অ্যান্‌‌ড্‌‌ নো প্লে মেকস জ্যাক এ ডাল বয়'- বালকদিগকে খেলিবার সুযোগ দেওয়া উচিত, কেননা, কেবল লেখাপড়া করিলে মনের স্ফুর্তি নষ্ট হয়। হ্যাঁ, হ্যাঁ, বালকদিগকে খেলিবার সুযোগ দেওয়া উচিত, কেননা, কেবল‌‌ই লেখাপড়া করিলে মনের স্ফুর্তি নষ্ট হয়- স্ফুর্তি সব মাটি । কেননা, কেবল‌‌ই লেখাপড়া মনের স্ফুর্তি নষ্ট হয়- এই আমাদের যেমন হয়েছে । কেননা-
পণ্ডিতঃ ও জায়গাটা পাঁচশোবার করে পড়তে হবেনা । তোর অন্য পড়া নেই ? -ঐ যে পুলিসটা যাচ্ছে, ওকে একটু ডাকা যাক্‌‌ । এই পাহারাওয়ালা - ইদিকে আও ।

[পুলিসের প্রবেশ]

পুলিসঃ কেয়া বোল্‌‌তা বাবু ?
পণ্ডিতঃ আহা, এইটা দেখি একেবারে নিরক্ষর মুর্খ ! আরে, পাশের বাড়িমে একঠো গানের ওস্তাদ হায় নেই ? উস্‌‌কো একদম কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান নেহি হায় - দিনরাত ভর কেবল সারে গামা ভাঁজতা হায় ।
পুলিসঃ কেয়া হোতা ?
পণ্ডিতঃ আরে, খেলে যা ! (সুর করিয়া) সারে গাগা মাপা ধানি ধানি এইসা করতা হায়-
পুলিসঃ হাম কেয়া করেগা বাবু- উ হামারা কাম নেহি ।
পণ্ডিতঃ নাঃ তোমার কাজ না ! মাইনে খাবে তুমি আর কাজ করবে বেচারাম তেলি !
পুলিসঃ হাঁ বাবু ।
পণ্ডিতঃ চেঁচাস কাঁহে ? ফের পূজার বকশিশ চায়গা ত এইসা উত্তম মধ্যম দেগা- থোঁতামুখ ভোঁতা কর দেগা ।
পুলিসঃ আরে, পাগলা হায়রে- পাগলা হায় ! [প্রস্থান]
পণ্ডিতঃ দেখ ! ছোঁড়াটার আর সারাশব্দ নেই ! ঘটে !
ঘটিরামঃ অ্যাঁ-
পণ্ডিতঃ 'অ্যাঁ' কি রে বেয়াদব ? 'আজ্ঞে' বলতে পারিসনে ? আধঘণ্টা ধরে 'অ্যাঁ' করতে লেগেছে ! বলি, পড়ছিস না কেন ?
ঘটিরামঃ হ্যাঁ, পড়ছিলাম ত !
পণ্ডিতঃ শুনতে পাই না কেন ? চেঁচিয়ে পড় !
ঘটিরামঃ (চিৎ‌কার) অন্ধকারে চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড
তাহাতে ডুবায়ে ধরে পাতকীর মুণ্ড-
পণ্ডিতঃ থাক্ থাক্‌‌- অত চেঁচাসনে- একেবারে কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছে ।

[কেষ্টার প্রবেশ]

কেষ্টাঃ লেখাপড়া করে যেই গাড়িচাপা পড়ে সেই । শুনলুম আজকে ও পাড়ায় গানের মজলিস হবে ।
পণ্ডিতঃ এতক্ষনে পড়তে এসেছিস ?
কেষ্টাঃ ' আই গো আপ্‌‌ , ইউ গো ডাউন '- সেই কখন এসেছি - এতক্ষন কত পড়ে ফেললাম ! ' আই গো আপ্‌‌ , ইউ গো ডাউন্‌‌ '-
পণ্ডিতঃ যা, যা, আমি যেন আর দেখিনি, কাল আসিস্‌‌ নি কেন ?
কেষ্টাঃ কালকে, কাল কি করে আসব ? ঝড় বৃষ্টি বজ্রাঘাত-
পণ্ডিতঃ ঝড় বৃষ্টি কিরে ? কাল ত দিব্যি পরিষ্কার ছিল !
কেষ্টাঃ আজ্ঞে, শুক্কুরবারের আকাশ, কিচ্ছু বিশ্বাস নেই কখন কি হয়ে পড়ে !
পণ্ডিতঃ বটে ! তোর বাড়ি কদ্দুর ?
কেষ্টাঃ আজ্ঞে, ঐ তালতলায়- 'আই গো আপ্‌‌ , ইউ গো ডাউন্‌‌ -' মানে কি?
পণ্ডিতঃ 'আই'- 'আই' কিনা চক্ষুঃ, 'গো- গয়ে ওকারে গো গৌ গাবৌ গাবঃ, ইত্যমরঃ 'আপ্' কিনা আপঃ সলিলং বারি অর্থাৎ‌ জল- গরুর চক্ষে জল- অর্থাৎ‌ কিনা গরু কাঁদিতেছে- কেন কাঁদিতেছে- না উই গো ডাউন', কিনা 'উই' অর্থাৎ‌ যাকে বলে উইপোকা- 'গো ডাউন', অর্থাৎ‌ গুদোমখানা- গুদোমঘরে উই ধরে আর কিছু রাখলে না- তাই না দেখে, 'আই গো আপ্‌‌ ' গরু কেবলি কান্দিতেছে-

[ঘটির বিকট হাস্য]

পণ্ডিতঃ ঘটে !
ঘটিরামঃ অ্যাঁ- না আজ্ঞে-
পণ্ডিতঃ ফের ওরকম বিটকেল শব্দ করবি ত পিটিয়ে সিধে করে দেব ।

[নিদ্রাচেষ্টা]

কেষ্টাঃ পণ্ডিতমশাই, ও পণ্ডিতমশাই !
ঘটিরামঃ ঘুমুচ্ছে? (ঠেলিয়া) ও পণ্ডিতমশাই ! কেষ্টা ডাকছে, কেষ্টা ডাকছে-
কেষ্টাঃ পণ্ডিতমশাই, এই জায়গাটা বুঝতে পারছি না ।
পণ্ডিতঃ হু!, দেখি নিয়ে আয়, কোন জায়গাটা- সব বলে দিতে হবে ! তোদের দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না ! 'ওয়ান্‌‌স্‌‌ আই মেট্‌‌ এ লেম্‌‌ ম্যান ইন এ স্ট্রিট নিয়ার মাই হাউস্‌‌ ' । 'ওয়ান্‌‌স্‌‌ আই মেট্‌‌ এ লেম্‌‌ ম্যান্‌‌ '- কিনা একদা এক বাঘের গলায় হাড় ফুটিয়াছিল ।' 'ইন্‌‌ এ স্ট্রিট'- সে বিস্তর চেষ্টা করিল 'নিয়ার মাই হাউস্‌‌ '- কিন্তু হাড় বাহির হই‌‌ল না । এই সোজা ইয়েটা বুঝতে পাল্‌‌লি না? (ঘটিরামের প্রতি) কিরে? পালাচ্ছিস যে !
ঘটিরামঃ নাঃ, পালাচ্ছি না ত ! কেষ্টা এমনি গোলমাল কচ্ছে- কিচ্ছু আঁক কষতে পাচ্ছি না ।
পণ্ডিতঃ কি আঁক দেখি নিয়ে আয় ।
ঘটিরামঃ আজ্ঞে এই যে ! এই চার সের আলুর দাম যদি দশ আনা হয় তবে আদ্‌‌ মোন পটলের দাম কত ?
পণ্ডিতঃ দেখি, চার সের আলু দশ আনা ত ! তবে আদ্‌‌ মোন পটল- আহা, আবার পটল এল কোত্থেকে ?
ঘটিরামঃ তা তো জানি না, বোধ হয় পটলডাঙা থেকে ?
পণ্ডিতঃ দুৎ‌ ! একি একটা আঁক হতে পারে ? গাধা কোথাকার !
ঘটিরামঃ তাই বলুন ! আমি কত যোগ করলাম, ভাগ করলাম, শেষটায় জি-সি-এম্‌‌ পর্যন্ত করলাম, কিছুতেই হচ্ছিল না। বড্ড শক্ত- না ?
পণ্ডিতঃ মেলা বকিস নে, যাঃ !
ঘটিরামঃ যাব ? ছুটি ?
কেষ্টাঃ ছুটি- ছুটি- ছুটি-
পণ্ডিতঃ না, না, ছুটি টুটি হবে না ।
ঘটিরামঃ হ্যাঁ ভাই, তুই সাক্ষী আছিস, বলেছে যা !
কেষ্টাঃ হ্যাঁরে, আমাদের কিন্তু দোষ নেই ।[প্রস্থান]
পণ্ডিতঃ দেখলে কাণ্ডটা ! এই সব হুজুকেই ত ছেলেগুলোকে মাটি করলে ! আর জমিদারমশাইয়ের আক্কেলটা দেখ - এখানে এসে অবধি দশভূতে তাকে পেয়ে বসেছে - দেখ দেখি, টাকা ওড়াবার জন্য শেষটায় কিনা গানের মজলিস ! ছ্যা ছ্যা !

[প্রস্থান]

জুড়ির গান


সাবধান হয়ে সবে অবধান কর রে ।
ওহে শিষ্য গুণধর কোলাহল ছাড় রে ।।
(আহা) কেনা জানে চণ্ডীবাবু ঝিঙেটোলার জমিদার ।
(আহা) অনুরক্ত ভক্ত মোরা চরণে প্রণমি তার ।।
(ওসে) বিক্রমে বিক্রমাদিত্য সর্বশাস্ত্রে ধুরন্ধর ।
(আহা) সাক্ষাৎ‌ যেন দাতাকর্ণ দানব্রতে ভয়ঙ্কর ।।
(এরা) খাচ্ছে দাচ্ছে ফুর্তি কচ্ছে নিত্য তারি কল্যাণে ।
(সেথা) চব্বিশ ঘণ্টা মারছে আড্ডা বখশিশাদি সন্ধানে ।।
(সেথা) নিত্য নতুন হচ্ছে হল্লা লোকারণ্য মারাত্মক ।
(সেথা) বাদ্যের ঘটা খাদ্যের ঘটা অর্থের শ্রাদ্ধ অনর্থক ।।
(আহা) একজন বড্ড সাধাসিধে ভেদ করে না আত্মপর ।
(আর) টাকার লোভে বসে থাকে যত ব্যাটা স্বার্থপর ।।
(ওরে) পণ্ডিৎ‌মশাই ব্যস্ত বড্ড চণ্ডীবাবুর হিতার্থ ।
(দেখ) অন্নলুচি ধ্বংস করি কচ্ছেন সবায় কৃতার্থ ।।
(আহা) বিদ্যে জাহির কচ্ছে সবাই পোলাও কোর্মা ভোজনে ।
(দেখ) যত রাজ্যের নিষ্কম্মার দল বাড়ছে সবাই ওজনে ।।
(ওরে) অবিশ্রান্ত হুজুক নিত্য মুহূর্তেকো শান্তি নেই ।
(আজ) পঞ্চ বর্ষ অন্ত হৈল ক্ষান্ত দেবার নামটি নেই ।।
(ওরে) কস্মিনকালে শুনি নাই রে এমন কাণ্ডকারখানা ।
(ওই) খোসামুদে ভণ্ডগুলো আহ্লাদেতে আটখানা ।।
(আহা) পুষ্পচন্দন বৃষ্টি হবে চণ্ডীবাবুর মস্তকে ।
(দেখ) অক্ষয় পুণ্য সঞ্চয় হবে চিত্রগুপ্তের পুস্তকে ।।

Sunday, 10 October 2010

আশ্চর্য কবিতা

চণ্ডীপুরের ইংরাজি স্কুলে আমাদের ক্লাশে একটি নূতন ছাত্র আসিয়াছে। তার বয়স বারো-চোদ্দোর বেশি নয়। সে আসিয়া প্রথম দিন‌‌ই সকলকে জানাইল, "আমি পোইট্‌‌রি লিখতে পারি !" একথা শুনিয়া ক্লশের অনেকেই অবাক হ‌‌ইয়া গেল; কেবল দুই-একজন হিংসা করিয়া বলিল, "আমরাও ছেলেবেলায় ঢের ঢের কবিতা লিখেছি।" নতুন ছাত্রটি বোধহয় ভাবিয়াছিল, সে কবিতা লিখিতে পারে শুনিয়া ক্লাশে খুব হুলুস্থুল পড়িয়া যাইবে এবং কবিতার নমুনা শুনিবার জন্য সকলে হা হা করিয়া উঠিবে। যখন সেরূপ কিছুর‌‌ই লক্ষণ দেখা গেল না তখন বেচারা, যেন আপন মনে কি কথা বলিতেছে, এরূপভাবে, যাত্রার মতো সুর করিয়া একটা কবিতা আওড়া‌‌ইতে লাগিল—

``ওহে বিহঙ্গম তুমি কিসের আশায়
বসিয়াছ উচ্চ ডালে সুন্দর বাসায়?
নীল নভোমণ্ডলেতে উড়িয়া উড়িয়া
কত সুখ পাও, আহা ঘুরিয়া ঘুরিয়া।
যদ্যপি থাকিত মম পুচ্ছ এবং ডানা
উড়ে যেতাম তব সনে নাহি শুনে মানা-

কবিতা শেষ হ‌‌ইতে না হ‌‌ইতে, ভবেশ তাহার মতো সুর করিয়া মুখভঙ্গী করিয়া বলিল-

আহা যদি থাকত তোমার
ল্যাজের উপর ডানা
উড়ে গেলেই আপদ যেত-
করত না কেউ মানা!

নূতন ছাত্র তাহাতে রাগিয়া বলিল, "দেখ বাপু, নিজেরা যা পার না, তা ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেওয়া ভারি সহজ। শৃগাল ও দ্রাক্ষাফলের গল্প শোনোনি বুঝি?" একজন ছেলে অত্যন্ত ভালোমানুষের মতো মুখ করিয়া বলিল, "শৃগাল এবং দ্রাক্ষাফল! সে আবার কি গল্প?" অমনি নূতন ছাত্রটি আবার সুর ধরিল-

বৃক্ষ হতে দ্রাক্ষাফল ভক্ষাণ করিতে
লোভী শৃগাল প্রবেশিল এক দ্রাক্ষা ক্ষেতে
কিন্তু হায় দ্রাক্ষা যে অত্যন্ত উচ্চে থাকে
শৃগাল নাগাল পাবে কিরূপে তাহাকে,
বারম্বার চেষ্টায় হয়ে অকৃতকার্য
'দ্রাক্ষা টক' বলিয়া পালাল ছেড়ে (সেই) রাজ্য---"।

সেই হ‌‌ইতে আমাদের হরেরাম একেবারে তাহার চেলা হ‌‌ইয়া গেল। হরেরামের কাছে আমরা শুনিলাম যে ছোকরার নাম শ্যামলাল। সে নাকি এত কবিতা লিখিয়াছে যে, একখানা আস্ত খাতা প্রায় ভরতি হ‌‌ইয়াছে আর আট-দশটি কবিতা হ‌‌ইলেই তাহার একশোটা পুরো হয়; তখন সে নাকি ব‌‌ই ছাপা‌‌ইবে।

ইহার মধ্যে একদিন এক কাণ্ড হ‌‌ইল। গোপাল বলিয়া একটি ছেলে স্কুল ছড়িয়া যা‌‌ইবে এই উপলক্ষে শ্যামলাল এক প্রকাণ্ড কবিতা লিখিয়া ফেলিল। তাহার মধ্যে 'বিদায় বিদায়' বলিয়া অনেক 'অশ্রুজল' 'দুঃখশোক' ইত্যাদি কথা ছিল। গোপাল কবিতার আধখানা শুনিয়াই একেবারে তেলে-বেগুনে জ্বলিয়া উঠিল। সে বলিল, "ফের যদি আমার নামে পো‌‌ইট্‌‌রি লিখবি তো মারব এক থাপ্পড়।" হরেরাম বলিল, "আহা বুঝলে না? তুমি স্কুল ছেড়ে যাচ্ছ কিনা, তা‌‌ই ও লিখেছে।" গোপাল বলিল, "ছেড়ে যাচ্ছি তা যাচ্ছি, তোর তাতে কি রে? ফের জ্যাঠামি করবি তো তোর কবিতার খাতা ছিঁড়ে দেব।"

দেখিতে দেখিতে শ্যামলালের কথা ইস্কুলময় রাষ্ট্র হ‌‌ইয়া পড়িল। তাহার দেখাদেখি আরও অনেকেই কবিতা লিখিতে শুরু করিল। ক্রমে কবিতা লেখার বাতিকটা ভয়ানক রকম ছোঁয়াচে হ‌‌ইয়া নিচের ক্লাশের প্রায় অর্ধেক ছেলেকে পা‌‌ইয়া বসিল। ছোট ছোট ছেলেদের পকেটে ছোট ছোট কবিতার খাতা দেখা দিল। বড়দের মধ্যে কেহ শ্যামলালের চেয়েও ভালো কবিতা লিখিতে পারে বলিয়া শোনা যা‌‌ইতে লগিল। ইস্কুলের দেয়ালে, পড়ার কেতাবে, পরীক্ষার খাতায়, চরিদিকে কবিতা গজাইয়া উঠিল।

পাঁড়েজির বৃদ্ধ ছাগল যেদিন শিং নাড়িয়া দড়ি ছিঁড়িয়া ইস্কুলের উঠানে দাপাদাপি করিয়ছিল, আর শ্যামলালকে তাড়া করিয়া খানায় ফেলিয়াছিল, তাহার পরদিন ভারতবর্ষের বড় ম্যাপের উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা বাহির হ‌‌ইল—

পাঁড়েজির ছাগলের একহাত দাড়ি,
অপরূপ রূপ তার যা‌‌ই বলিহারি !
উঠানে দাপটি করি নেচেছিল কাল
তারপর কি হ‌‌ইল জানে শ্যামলাল।

শ্যামলালের রঙটি কালো কিন্তু কবিতা পড়িয়া সে যথার্থ‌‌ই চটিয়া লাল হ‌‌ইল, এবং তখনি তাহার নিচে একটা কড়া জবাব লিখিতে লাগিল। সে সবেমাত্র লিখিয়াছে— 'রে অধম কাপুরুষ পাষণ্ড বর্বর-' এমন সময় গুরু গম্ভীর গলা শোনা গেল— "ম্যাপের উপর কি লেখা হচ্ছে?" ফিরিয়া দেখে হেড মাস্টার মহাশয় ! শ্যামলাল একেবারে থতমত খা‌‌ইয়া বলিল, "আজ্ঞে স্যার, ওরা আগে লিখেছিল।" "ওরা কারা?" শ্যামলাল বোকার মত একবার আমাদের দিকে, একবার কড়িকাঠের দিকে তাকাইতে লাগিল, কাহার নাম করিবে বুঝিতে পারিল না। মাস্টার মহাশয় আবার বলিলেন, "ওরা যদি পরের বাড়িতে সিঁদ কাটতে যায়, তুমিও কাটবে?" যাহা হ‌‌উক সেদিন অল্পের উপর দিয়াই গেল, শ্যামলাল একটু ধমক-ধামক খা‌‌ইয়াই খালাস পা‌‌ইল।

ইহার মধ্যে একদিন আমাদের পণ্ডিতমশাই গল্প করিলেন যে, তাঁহার সঙ্গে যাহারা এক ক্লাশে পড়িত, তাহাদের মধ্যে একজন নাকি অতি সুন্দর কবিতা লিখিত। একবার ইন্‌‌স্পেক্টর ইস্কুল দেখিতে আসিয়া, তাহার কবিতা শুনিয়া এমন খুশি হ‌‌ইয়াছিলেন যে, তাহাকে একটা সুন্দর ছবিওয়ালা ব‌‌ই উপহার দিয়াছিলেন।

ইহার মাসখানেক পরেই ইন্‌‌স্পেক্টর ইস্কুল দেখিতে আসিলেন। প্রায় বিশ-পঁচিশটি ছেলে সাবধানে পকেটের মধ্যে লুকা‌‌ইয়া কবিতার কাগজ আনিয়াছে। বড় হলের মধ্যে সমস্ত স্কুলের ছেলেদের দাঁড় করানো হ‌‌ইয়াছে, হেডমাস্টার মহাশয় ইন্‌‌স্পেটরকে ল‌‌ইয়া ঘরে ঢুকিতেছেন— এমন সময় শ্যামলাল আস্তে আস্তে পকেট হ‌‌ইতে একটি কাগজ বহির করিল। আর যায় কোথা ! পাছে শ্যামলাল আগেই তাহার কবিতা পড়িয়া ফেলে, এই ভয়ে ছোট বড় একদল কবিতাওয়ালা একসঙ্গে নানাসুরে চীৎ‌কার করিয়া যে যার কবিতা হাঁকিয়া উঠিল। মনে হ‌‌ইল, সমস্ত বাড়িটা কর্তালের মতো ঝন্‌‌ঝন্‌‌ করিয়া বাজিয়া উঠিল, ইন্‌‌স্পেক্টর মহাশয় মাথা ঘুরিয়া মাঝ পথেই মেঝের উপর বসিয়া পড়িলেন। ছাদের উপর একটা বিড়াল ঘুমা‌‌ইতেছিল, সেটা হঠাৎ‌ হাত পা ছুড়িয়া তিনতলা হ‌‌ইতে পড়িয়া গেল, ইস্কুলের দারোয়ান হ‌‌ইতে অফিসের কেশিয়ার বাবু পর্যন্ত হাঁ হাঁ করিয়া ছুটিয়া আসিল। সকলে সুস্থ হ‌‌ইলে পর মাস্টার মহাশয় বলিলেন, "এতো চেঁচালে কেন?" সকলে চুপ করিয়া রহিল। আবার জিজ্ঞাসা করা হ‌‌ইল, "কে কে চেঁচিয়েছিল?" পাঁচ-সাতটি ছেলে একসঙ্গে বলিয়া উঠিল— "শ্যামলাল।" শ্যামলাল যে একা অত মারাত্মক রকম চেঁচা‌‌ইতে পারে, এ কথা কেহ‌‌ই বিশ্বাস করিল না। যতগুলি ছেলের পকেটে কবিতার খাতা পাওয়া গেল, স্কুলের পর তাহাদের দেড়ঘণ্টা আটকা‌‌ইয়া রাখা হ‌‌ইল।

অনেক তম্বিতম্বার পর একে একে সমস্ত কথা বাহির হ‌‌ইয়া পড়িল। তখন হেডমাস্টার মহাশয় বলিলেন, "কবিতা লেখার রোগ হয়েছে? ও রোগের ওষুধ কি?" বৃদ্ধ পণ্ডিতমহাশয় বলিলেন, "বিষস্য বিষমৌষধম্‌‌, বিষের ওষুধ বিষ। বসন্তের ওষুধ যেমন বসন্তের টিকা, কবিতার ওষুধ তস্য টিকা। তোমরা যে যে কবিতা লিখেছ তার টিকা করে দিচ্ছি। তোমরা এক মাস প্রতিদিন পঞ্চাশ বার করে এটা লিখে এনে স্কুলে আমায় দেখাবে" এই বলিয়া তিনি টিকা দিলেন—

পদে পদে মিল খুঁজে, গুণে দেখি চৌদ্দ
এই দেখ লিখে দিনু কি ভীষণ পদ্য !
এক চোটে এইবারে উড়ে গেল সবি তা,
কবিতার গুতো মেরে গিলে ফেলি কবিতা।

একমাস তিনি কবিদের এই লেখা প্রতিদিন পঞ্চাশবার আদায় না করিয়া ছাড়িলেন না। এ কবিতার কি আশ্চর্যগুণ- তারপর হ‌‌ইতে কবিতা লেখার ফ্যাশান স্কুল হ‌‌ইতে একেবারেই উঠিয়া গেল।

http://www.deshiboi.com/component/hotproperty/index.php?option=com_hotproperty&view=property&id=490&tech=1&nsnid=490

Friday, 8 October 2010

অতিকায় জাহাজ

শৌখিন ধনীদের জন্য আর বড়ো-বড়ো ব্যবসায়ীদের জন্য যে সমস্ত জাহাজ অতলান্তিক মহাসাগরের খেয়া পারাপার করে, তেমন বড়ো জাহাজ পৃথিবীর আর কোথাও নাই। কি করে খুব তাড়াতাড়ি সাগর পার করা যায় আর আরামে পার করা যায়, আর একসঙ্গে অনেক লোককে বিনা কষ্টে পার করা যায়, তার জন্য বড় বড় জাহাজ কোম্পানিদের মধ্যে রেষারেষি চলে। এক-একটা জাহাজ নয়, যেন এক-একটা শহর, রাজারাজড়ার থাকবার মতো শহর। তারই খুব বড়ো দু-একটির নমুনা দেওয়া হয়েছে।

জাহাজের সাঁতার-ঘরটি দেখা যাক। মধ্যেকার চৌবাচ্চাটি হচ্ছে ২২ গজ লম্বা আর ১৮ গজ চওড়া। এ ছাড়া নানারকম স্নানের ঘর, তুর্কী হামাম, ফোয়ারা-স্নান প্রভৃতির আলাদা বন্দোবস্ত আছে। ১২ তলা জাহাজ, তার মাঝিমাল্লা যাত্রী সব নিয়ে লোকসংখ্যা ৫০০০ হবে। পাঁচটি জাহাজ লম্বালম্বি সার বেঁধে দাঁড়ালে, এক মাইল পথ জুড়ে বসবে।

একটি জাহাজের এক সপ্তাহের খোরাক হল ২২টা ট্রেন বোঝাই কয়লা--- এক-একটা ট্রেনে সাড়ে আট হাজার মণ। জাহাজের মানুষগুলোর খোরাকের হিসাবও বড়ো কম নয়। এক-এক যাত্রায় পশুমাংস ৭০০ মণ, পাখির মাংস ১৫০ মণ, মাছ ১২৫ মণ, ডিম ৪৮,০০০, আলু ১,৬০০ মণ, তরিতরকারি ৪০০ মণ, টিনের সবজি ৬,০০০ টিন আর কফি ও চা ৯০ মণ লাগে। তাছাড়া ফল দুধ কোকো চকোলেট ইত্যাদিও সেইরকম পরিমাণে।

জাহাজের মধ্যে বড়ো বড়ো খানাঘর চা-ঘর ইত্যাদি তো আছেই, তা ছাড়া নানারকম হোটেল সরাই-এর অভাব নেই। ধোপা, নাপিত, ফুলের দোকান, ছবির দোকান, মিঠাই-এর দোকান, প্রকাণ্ড থিয়েটার ও নাচঘর এসবও জাহাজের মধ্যেই পাবে। উঠবার জন্য লিফ্‌ট্‌ বা চলতিঘর। ইচ্ছা করলে আর টাকা থাকলে, সেখানে আল্‌গা বাড়ি ভাড়ার মতো করে থাকা যায়--- একবারের (অর্থাত্‍ ৫ দিনের) বাড়িভাড়া ধর ১৫,০০০ টাকা। এক-একটি জাহাজ করতে খরচ হয় প্রায় দু-তিন কোটি টাকা।

Thursday, 7 October 2010

জাহাজ ডুবি

সমুদ্রে চলিতে চলিতে প্রতি বত্‍সরই কত জাহাজ ডুবিয়া মরে। কেহ মরে ঝড় তুফানে, কেহ মরে ঢেউয়ের ঝাপ্‌টায়, কেহ মরে পাহাড়ের গুঁতায়, আর কেহ মরে অন্য জাহাজের ধাক্কা লাগিয়া--- যুদ্ধের কথা না হয় ছাড়িয়াই দিলাম। এইরকম কত উপায়ে জাহাজ ডুবিতেছে তাহার ঠিকানাই নাই। এইসকল জাহাজের মধ্যে কত সময় কত লাখ লাখ টাকার জিনিস থাকে, সেগুলি সমুদ্রের তলায় পড়িয়া নষ্ট হইবে--- ইহা কি মানুষের সহ্য হয়? বিলাতে বড় বড় ব্যবসাদার কোম্পানি আছে, তাহারা ডোবা-জাহাজ হইতে মাল উদ্ধার করে। এই কাজকে Salvage বলে! ইহাতে তাহারা এক-একসময় অনেক টাকা লাভ করিয়া থাকে। গভীর সমুদ্রে জাহাজ ডুবিলে তাহাকে আর বাঁচাইবার উপায় থাকে না; কিন্তু জল যদি খুব বেশি না হয় তবে অনেক সময় একেবারে জাহাজকে-জাহাজ উঠাইয়া ফেলা যায়।

জাহাজ উঠাইবার নানারকম উপায় আছে। এক উপায়, তাহার সঙ্গে বাতাস-পোরা বড় বড় বাক্স বাঁধিয়া তাহাকে হালকা করিয়া ভাসাইয়া তোলা। আর এক উপায়, তাহার চারিদিকে দেয়াল ঘিরিয়া সেই দেয়ালের ভিতরকার সমুদ্রকে `পাম্প্‌' দিয়া শুকাইয়া ফেলা। রুশ-জাপান যুদ্ধের সময় জাপানীরা যখন পোর্ট আর্থার দখল করে তখন সেখানকার বন্দরে রুশেরা কতগুলা জাহাজ ডুবাইয়া দিয়াছিল। জাপানীরা দেয়াল তুলিয়া সমস্ত বন্দরের মুখ আঁটিয়া দেয়; তার পর বড়ো বড়ো কল দিয়া বন্দরের জল সেঁচিয়া ফেলিতেই জাহাজগুলা বাহির হইয়া পড়িল। জাপানীরা সেই জাহাজ আবার মেরামত করাইয়া কাজে লাগাইয়াছে।

একবার স্পেন হইতে কিছু দূরে একটি জাহাজ জখম হইয়া ডুবিতে আরম্ভ করে। জাহাজের কাপ্তান দেখিল স্পেন পর্যন্ত পৌঁছিবার আগেই জাহাজ ডুবিয়া যাইবে। জাহাজের নীচেকার খোলে হাজার মণ লবণ বোঝাই রহিয়াছে--- সকলে মিলিয়া সারাদিন লবণ ফেলিলেও তাহার কিছুই কম্‌তি হইবে না। তাই তিনি হুকুম দিলেন, ``জাহাজ ছাড়িতে হইবে, নৌকা নামাও।'' এমন সময় এক সালভেজ কোম্পানির জাহাজ আসিয়া হাজির--- তাহারা আসিয়াই ব্যাপার দেখিয়া জাহাজ ডুবিবার আগেই তাহা কিনিতে চাহিল। লবণ-জাহাজের কাপ্তান বলিল, ``মাঝ সমুদ্রে জাহাজ ডুবিলে কিনিয়া লাভ কি?'' সালভেজ কাপ্তান বলিল, ``জাহাজ ডুবিতে দিব না।'' শুনিয়া লবণের কাপ্তান হাসিয়া বলিল, ``আমি ত জাহাজ ছাড়িয়াই দিব --- তুমি কিনিতে চাও আমার আপত্তি কি?'' জাহাজ কিনিয়াই নূতন কাপ্তান তাহাতে জল বোঝাই করিতে লাগিল--- পুরাতন নাবিকেরা বলিল, ``আহা কর কি? একেই জাহাজ ডুবিতেছে, আবার জল চাপাইতেছ? তুমি পাগল নাকি?'' কাপ্তান কোন কথা না বলিয়া লবণের মধ্যে ক্রমাগতই জল ঢালিতে লাগিল। তারপর সমস্ত লবণ জলে গুলিয়া সেই লবণ-গোলা জলে পাম্প বসাইয়া হুড়্‌হুড়্‌ করিয়া জল সেঁচিয়া ফেলিল। জাহাজ হালকা হইয়া ভাসিয়া উঠিল। পুরাতন কাপ্তান ব্যাপার দেখিয়া আহাম্মক বনিয়া মাথা চুলকাইতে লাগিল।

Wednesday, 19 May 2010

মন্ডা ক্লাবের কয়েকটি আমন্ত্রণপত্র



সম্পাদক বেয়াকুব
কোথা যে দিয়েছে ডুব-
এদিকেতে হায় হায়
ক্লাবটি তো যায় যায়।

তাই বলি সোমবারে
মদগৃহে গড়পারে
দিলে সবে পদধূলি
ক্লাবটিরে ঠেলে তুলি।

রকমারি পুঁথি কত
নিজ নিজ রুচিমত
আনিবেন সাথে সবে
কিছু কিছু পাঠ হবে

করযোড়ে বারবার
নিবেদিছে সুকুমার।



কেউ বলেছে খাবো খাবো,
কেউ বলেছে খাই
সবাই মিলে গোল তুলেছে-
আমি তো আর নাই।

ছোটকু বলে, রইনু চুপে
ক'মাস ধরে কাহিল রূপে!
জংলি বলে "রামছাগলের
মাংস খেতে চাই।"

যতই বলি "সবুর কর" -
কেউ শোনে না কালা,
জীবন বলে কোমর বেধে,
কোথায় লুচির থালা?

খোদন বলে রেগেমেগে
ভীষণ রোষে বিষম লেগে-
বিষ্যুতে কাল গড়পারেতে
হাজির যেন পাই।


শনিবার ১৭ ই
সাড়ে পাঁচ বেলা,
গড়পারে হৈ হৈ
সরবতী মেলা।

অতএব ঘড়ি ধরে
সাবকাশ হয়ে
আসিবেন দয়া করে
হাসিমুখে লয়ে।

সরবৎ সদালাপ
সঙ্গীত - ভীতি
ফাঁকি দিলে নাহি মাপ,
জেনে রাখ-ইতি।


আমি,অর্থাৎ সেক্রেটারি,
মাসতিনেক কল‌কেতা ছাড়ি
যেই গিয়েছি অন্য দেশে
অমনি কি সব গেছে ফেঁসে।

বদলে গেছে ক্লাবের হাওয়া,
কাজের মধ্যে কেবল খাওয়া!
চিন্তা নেইক গভীর বিষয়
আমার প্রাণে এসব কি সয়?

এখন থেকে সম্‌‌ঝে রাখ
এ সমস্ত চলবে নাকো,
আমি আবার এইছি ঘুরে
তান ধরেছি সাবেক সুরে।

শুনবে এস সুপ্রবন্ধ
গিরিজার বিবেকানন্দ,
মঙ্গলবার আমার বাসায়।
(আর থেক না ভোজের আশায়)

সাহস

পুলিশ দেখে ডরাইনে আর, পালাইনে আর ভয়ে,
আরশুলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।
আধাঁর ঘরে ঢুকতে পারি এই সাহসের গুণে,
আর করে না বুক দুর্ দুর্ জুজুর নামটি শুনে।
রাত্তিরেতে একলা শুয়ে তাও ত থাকি কত,
মেঘ ডাকলে চেঁচাইনেকো আহাম্মুকের মত।
মামার বাড়ির কুকুর দুটোর বাঘের মত চোখ,
তাদের আমি খাবার খাওয়াই এমনি আমার রোখ্!
এম্‌‌নি আরো নানান দিকে সাহস আমার খেলে
সবাই বলে "খুব বাহাদুর" কিংবা "সাবাস ছেলে"।
কিন্তু তবু শীতকালেতে সকালবেলায় হেন
ঠান্ডা জলে নাইতে হ'লে কান্না আসে কেন?
সাহস টাহস সব যে তখন কোনখানে যায় উড়ে-
ষাড়ের মতন কন্ঠ ছেড়ে চেঁচাই বিকট সুরে!

কানা-খোঁড়া সংবাদ

পুরাতন কালে ছিল দুই রাজা,
নাম ধাম নাহি জানা,
একজন তার খোড়া অতিশয়,
অপর ভূপতি কানা।
মন ছিল খোলা, অতি আলো ভোলা
ধরমেতে ছিল মতি,
পর ধনে সদা ছিল দোঁহাকার
বিরাগ বিকট অতি।
প্রতাপের কিছু নাহি ছিল ত্রুটি
মেজাজ রাজারি মত,
শুনেছি কেবল, বুদ্ধিটা নাকি
নাহি ছিল সরু তত,
ভাই ভাই মত ছিল দুই রাজা,
না ছিল ঝগড়াঝাঁটি,
হেনকালে আসি তিন হাত জমি
সকল করিল মাটি।
তিন হাত জমি হেন ছিল, তাহা
কেহ নাহি জানে কার,
কহে খোঁড়া রায় "এক চক্ষু যার
এ জমি হইবে তার"।'
শুনি কানা রাজা ক্রোধ করি কয়
"আরে অভাগার পুত্র,
এ জমি তোমারি- দেখ না এখনি
খুলিয়া কাগজ পত্র"।
নক্সা রেখেছে এক বছর
বাক্সে বাঁধিয়া আঁটি,
কীট কুটমতি কাটিয়া কাটিয়া
করিয়াছে তারে মাটি ;
কাজেই তর্ক না মিটিল হায়
বিরোধ বাধিল ভারি,
হইল য্দ্দু হদ্দ মতন
চৌদ্দ বছর ধরি।
মরিল সৈন্য, ভাঙিল অস্ত্র,
রক্ত চলিল বহি,
তিন হাত জমি তেমনি রহিল,
কারও হার জিত নাহি
তবে খোঁড়া রাজা কহে, হায় হায়,
তর্ক নাহিক মিটে,
ঘোরতর রণে অতি অকারণে
মরণ সবার ঘটে"
বলিতে বলিতে চঁটাৎ করিয়া
হঠাৎ মাথায় তার
অদ্ভুত এক বুদ্ধি আসিল
অতীব চমৎকার।
কহিল তখন খোঁড়া মহারাজ,
শুন মোর কানা ভাই,
তুচ্ছ কারণে রক্ত ঢালিয়া
কখনও সুযশ নাই।
তার চেয়ে জমি দান করে ফেল
আপদ শান্তি হবে।"
কানা রাজা কহে, খাসা কথা ভাই,
কারে দিই কহ তবে।"
কহেন খঞ্জ, " আমার রাজ্যে
আছে তিন মহাবীর-
একটি পেটুক, অপর অলস,
তৃতীয় কুস্তিগীর।
তোমার মুলুক কে আছে এমন
এদের হারাতে পারে?-
সবার সমুখে তিন হাত জমি
বকশিস দিব তারে।
কানা রাজা কহে ভীমের দোসর
আছে ত মল্ল মম,
ফালাহারে পটু, পঁচাশি পেটুক
অলস কুমড়া সম।
দেখা যাবে কার বাহাদুরি বেশি
আসুক তোমার লোক;
যে জিতিবে সেই পাবে এই জমি-
খোড়া বলে, তাই হোক।
পড়িল নোটিস ময়দান মাঝে
আলিশান সভা হবে,
তামাসা দেখিতে চারিদিক হতে
ছুটিয়া আসিল সবে।
ভয়ানক ভিড়ে ভরে পথঘাট,
লোকে হল লোকাকার,
মহা কোলাহল দাড়াবার ঠাই
কোনোখানে নাহি আর।
তারপর ক্রমে রাজার হুকুমে
গোলমাল গেল থেমে,

দুইদিক হতে দুই পালোয়ান
আসরে আসিল নেমে।
লম্ফে ঝম্ফে যুঝিল মল্ল
গজ-কচ্ছপ হেন,
রুষিয়া মুষ্টি হানিল দোহায়-
বজ্র পড়িল যেন!
গুঁতাইল কত ভোঁতাইল নাসা
উপাড়িল গোফ দাড়ি,
যতেক দন্ত করিল অন্ত
ভীষণ চাপটি মারি
তারপরে দোঁহে দোঁহারে ধরিয়া
ছুঁড়িল এমনি জোরে,
গোলার মতন গেল গো উড়িয়া
দুই বীর বেগভরে।
কিহল তাদের কেহ নাহি জানে
নানা কথা কয় লোকে,
আজও কেহ তার পায়নি খবর,
কেহই দেখেনি চোখে।
যাহোক এদিকে, কুস্তির শেষে
এল পেটুকের পালা,
যেন অতিকায় ফুটবল দুটি,
অথবা ঢাকাই জালা।
ওজনেতে তারা কেহ নহে কম,
ভোজনেতে ততোধিক,
বপু সুবিপুল, ভুড়ি বিভীষন-
ভারি সাতমন ঠিক।
অবাক দেখিছে সভার সকলে
আজব কান্ড ভারি-
ধামা ধামা লুচি নিমেষে ফুরায়
দই ওঠে হাঁড়ি হাঁড়ি!
দাড়ি পাল্লায় মাপিয়া সকলে
দেখে আহারের পরে ,
দুজনেই ঠিক বেড়েছে ওজনে
সাড়ে তিন মন করে।
কানা রাজা বলে একি হল জ্বালা,
আক্কেল নাই কারো ,
কেহ কি বোঝেনা সোজা কথা এই,
হয় জেতো নয় হারো।"
তার পর এল কুঁড়ে দুই জন
ঝাকার উপর চড়ে,
সভামাঝে দোহে শুয়ে চিৎপাত
চুপ চাপ রহে পড়ে।
হাত নাহি নাড়ে, চোখ নাহি মেলে,
কথা নাই কারো মুখে,
দিন দুই তিন রহিল পড়িয়া,
নাসা গীত গাহি সুখে।
জঠরে যখন জ্বলিল আগুন,
পরান কণ্ঠাগত,
তখন কেবল মেলিয়া আনন
থাকিল মড়ার মত।
দয়া করে তবে সহৃদয় কেহ
নিকটে আসিয়া ছুটি
মুখের নিকটে ধরিল তাদের
চাটিম কদলি দুটি।
খঞ্জের লোকে কহিল কষ্টে,
"ছাড়িয়া দে নারে ভাই"
কানার ভৃত্য রহিল হা করে
মুখে তার কথা নাই ।
তখন সকলে কাষ্ঠ আনিয়া
তায় কেরোসিন ঢালি,
কুড়েদের গায়ে চাপাইয়া রোষে
দেশলাই দিল জ্বালি।
খোঁড়ার প্রজাটি বাপরে বলিয়া
লাফ দিয়া তাড়াতাড়ি
কম্পিত পদে চম্পট দিল
একেবারে সভা ছাড়ি।
দুয়ো বলি সবে দেয় করতালি
পিছু পিছু ডাকে "ফেউ"?
কানার অলস বলে কি আপদ
ঘুমুতে দিবিনা কেঊ?
শুনে সবে বলে "ধন্য ধন্য
কুঁড়ে-কুল চুড়ামণি!"
ছুটিয়া তাহারে বাহির করিল
আগুন হইতে টানি।
কানার লোকের গুণপনা দেখে
কানা রাজা খুসী ভারি,
জমিতে দিলেই আরও দিল কত,
টাকাকড়ি ঘরবাড়ি।